ইভিএম কারচুপির মিথ ও বাস্তবতা - বৈজ্ঞানিক সত্য ও রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি

ইভিএম কারচুপির মিথ ও বাস্তবতা

বৈজ্ঞানিক সত্য ও রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি

▎অনির্বাণ তলাপাত্র - ১লা মে, ২০২৬ ▎

যে কোন নির্বাচনে জনতার রায়ই হল শেষ কথা। কিন্তু বাংলার তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা ঠিকই করে রেখেছেন যে তাঁরা কোনওভাবেই এই "পাবলিক ম্যান্ডেট" কে মেনে নেবেন না। নির্বাচনের ফলাফলে একটু অন্যরকমের কিছুর আঁচ পেলেই তাঁরা "ইভিএম কারচুপি"-র রব তুলবেন; অথচ জিতলেই এই প্রসঙ্গকে সিন্দুকে পুরে বিজয়োল্লাসে মেতে উঠবেন। আসলে বাংলার তথা এই দেশের রাজনীতিকদের জনগণের বা তাদের নিজেদের দলের সমর্থক ও ভোটারদের উপরেই কোন আস্থা নেই।

ভারতীয় নির্বাচন - ভোটদানের দৃশ্য

ইভিএম কারচুপি - সত্য নাকি রাজনৈতিক গিমিক

২০১০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের অধ্যাপক জন অ্যালেক্স হ্যাল্ডারম্যান, ভারতীয় প্রকৌশলী হরি কে. প্রসাদ এবং অন্যান্যরা মিলে একটি দ্বিতীয় প্রজন্মের (M2) সিরিজের বাস্তব ইভিএম নিয়ে গবেষণা (তথ্যসূত্র ১) করে প্রমাণ করেছিলেন যে এই ধরণের ইভিএমগুলিকে তাত্ত্বিকভাবে দুটি উপায়ে "হ্যাক" বা "ম্যানিপুলেট" করা যেতে পারে — "ডিসঅনেস্ট ডিসপ্লে অ্যাটাক" ও "মেমরি ম্যানিপুলেটর অ্যাটাক"। প্রথম পদ্ধতিতে, ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটের আসল ডিসপ্লে বোর্ড খুলে তার জায়গায় একটি হুবহু-দেখতে একইরকম বোর্ড বসানো হয়, যার ভিতরে লুকানো থাকে একটি ব্লুটুথ রেডিও চিপ ও একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার। এই নকল বোর্ড মোবাইল ফোন থেকে ওয়্যারলেস সিগন্যাল পেয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কিছু শতাংশ ভোট চুরি করে জাল ফলাফল দেখাতে পারে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে, ইভিএমের মেমরি চিপে সরাসরি একটি কাপড়ের ক্লিপের মত ইলেক্ট্রনিক ক্লিপ লাগিয়ে মেমরিতে জমা থাকা ভোটের ডেটা পড়ে নেওয়া ও পুনর্লিখন করা যায়। হ্যাল্ডারম্যান বলেছিলেন, মাত্র কয়েক ডলারের যন্ত্রাংশ দিয়েই এই আক্রমণ সম্ভব।

ইভিএম মেশিন

ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) — প্রতীকী ছবি

কিন্তু এই প্রতিটি "হ্যাকিং" বা "ম্যানিপুলেশান"-এর জন্যই অপরিহার্য শর্ত হলো যে ইভিএম মেশিনটিকে খুলে তার অভ্যন্তরে কারসাজি করতে হবে। গবেষণাগারে বিনা বাধায় এটি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব নির্বাচনে? নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা বলছে, একটি ইভিএম সর্বোচ্চ ১,২০০টি ভোট ধারণ করতে পারে (তথ্যসূত্র ২)। SIR-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটার সংখ্যা এখন প্রায় ৬.৭৭ কোটি (তথ্যসূত্র ৩)। অর্থাৎ প্রাইমারি স্কুলের অঙ্ক অনুযায়ী এই নির্বাচনে অন্ততপক্ষে ৬,৭৭,০০,০০০ ÷ ১,২০০ = ৫৬,৪১৭টি ইভিএম ব্যবহার করতেই হবে। এই ছাপ্পান্ন হাজারেরও বেশি স্বতন্ত্র, ইন্টারনেট-বিচ্ছিন্ন যন্ত্র ছড়িয়ে আছে বাংলার ২৯৪টি আসনের হাজার হাজার পোলিং স্টেশনে; কেবলমাত্র দ্বিতীয় দফাতেই ৪১,০০১টি পোলিং স্টেশন (তথ্যসূত্র ৪) স্থাপন করা হয়েছে। কোনো সেন্ট্রাল সার্ভার হ্যাক করে এই সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজার ভিন্ন ভিন্ন মেশিনের স্মৃতিতে ঢোকা সম্ভব নয়।

৫৬,৪১৭+
ইভিএম প্রয়োজন
৬.৭৭ কোটি
মোট ভোটার
২৯৪
আসন
৪১,০০১
পোলিং স্টেশন (২য় দফা)

সুতরাং, ইভিএম কারচুপি করে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করতে গেলে একটি বা একশোটি বা এক হাজারটি নয়, সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজার বার নিখুঁতভাবে, না ধরা পড়ে, প্রতিটা ইভিএম মেশিন খুলে কারচুপি করতে হবে। কথাটা শুনতেই অবাস্তব লাগছে, অথচ এই আজগুবি গল্পই এখন রাজনৈতিকভাবে ফলাও করে ছড়ানো হচ্ছে। ভোটের আগে মেশিন বণ্টন থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ শেষে কন্ট্রোল ইউনিটকে গালা দিয়ে সিল করা — এই সবই হয় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের চোখের সামনে। তারপর সেই মেশিন যায় সশস্ত্র পুলিশ পাহারায়, দ্বৈত-তালাবদ্ধ স্ট্রংরুমে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা চলতে থাকে, এবং সব দলের প্রতিনিধিরা সেই ফুটেজ দেখার আইনগত অধিকার রাখেন। তাই মিডিয়াসহ রাজ্যের মানুষের চোখের সামনে এই কড়া নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে হাজারে হাজারে ইভিএমের ভিতরে ব্লুটুথ চিপ বসানো বা মেমরি ক্লিপ লাগানোকে যারা "সহজ" ভাবছেন, তারা কেবল নিজেদের বোকা না, বরং বাংলার সার্বভৌমিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকেও চূড়ান্ত অপমান করছেন।

সশস্ত্র নিরাপত্তা সিসিটিভি নজরদারি

স্ট্রংরুমে কড়া নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি — প্রতীকী ছবি

এর থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে হ্যাল্ডারম্যান-প্রসাদের গবেষণাটি হয়েছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের ইভিএম (M2) নিয়ে। বর্তমানে ভারতে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের (M3) ইভিএম, যার নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য আরও উন্নত (তথ্যসূত্র ৫)। ২০১৩ সালের পর থেকে চালু হওয়া M3 ইভিএম-এ থাকা "ট্যাম্পার ডিটেকশন" (তথ্যসূত্র ৬) প্রযুক্তি এতটাই স্পর্শকাতর যে কেউ যদি জোর করে মেশিনের আবরণ বা "কেসিং" খোলারও চেষ্টা করে, সঙ্গে সঙ্গেই ইভিএম স্থায়ীভাবে অচল বা "ইনঅপারেটিভ" হয়ে যায়। এর পাশাপাশি "মিউচুয়াল অথেন্টিকেশন " বা পারস্পরিক প্রমাণীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কন্ট্রোল ইউনিট (CU), ব্যালট ইউনিট (BU), এবং ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (VVPAT) যখন সংযুক্ত হয়, তখন তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের "ডিজিটাল হ্যান্ডশেক" সম্পন্ন করে (তথ্যসূত্র ৭)। এই প্রক্রিয়ায় "পাবলিক কি ইন্টারফেস" (PKI) ভিত্তিক এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিটি অংশ অন্য অংশের "অকৃত্রিমতা" যাচাই করে। যদি কোনো বহিরাগত কেউ বাজার থেকে কেনা কোনো নকল যন্ত্র বা সার্কিট ইভিএমে বসানোর চেষ্টা করে, তাহলে ডিজিটাল স্বাক্ষরের মিল হবে না, আর পুরো সিস্টেম কাজ করাই বন্ধ করে দেবে। M3 ইভিএমে ব্যবহৃত মাইক্রোকন্ট্রোলার চিপটি হলো "মাস্কড প্রোগ্রামেবল রিড ওনলি মেমোরি" (PROM) প্রযুক্তিতে তৈরি। এটি একটি "ওয়ান-টাইম প্রোগ্রামেবল" (OTP) চিপ (তথ্যসূত্র ৮)। বেল (BEL) বা ইসিআইএল (ECIL)-এর অত্যন্ত সুরক্ষিত কারখানায় একবার এর ভেতরে সফটওয়্যার লোড করে দেওয়ার পর, তা আর কখনোই পাল্টানো, রি-রাইট করা বা মুছে ফেলা যায় না। এটি একটি সম্পূর্ণ স্ট্যান্ড-অ্যালোন যন্ত্র; এর ভেতরে ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি, ফলে দূর থেকে কারসাজির সামান্যতম সুযোগও নেই। শুধু তাই নয়, প্রতিবার মেশিনটি চালু করার সময় এটি একটি "অ্যাডভান্সড সেলফ-ডায়াগনস্টিক" পরীক্ষা সম্পন্ন করে, যা গোটা হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পরীক্ষা করে নেয়। কোথাও এতটুকু গরমিল হলেই ইভিএম তার কাজ করা বন্ধ করে দেবে (তথ্যসূত্র ৯)।

🔒 M3 ইভিএম-এর মূল নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য: ট্যাম্পার ডিটেকশন (খুললেই অচল), মিউচুয়াল অথেন্টিকেশন (PKI-ভিত্তিক ডিজিটাল হ্যান্ডশেক), ওয়ান-টাইম প্রোগ্রামেবল চিপ (পরিবর্তন অসম্ভব), এবং সম্পূর্ণ স্ট্যান্ড-অ্যালোন (কোনো ওয়্যারলেস সংযোগ নেই)।
M3 ইভিএম প্রযুক্তি

ছবি: তৃতীয় প্রজন্মের (M3) ইভিএম — অত্যাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে সজ্জিত

ইভিএমের সঙ্গে এখন ভোটার-ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (VVPAT) বাধ্যতামূলক। ভোটার বোতাম চাপার পর একটি কাগজের স্লিপে নিজের ভোট দেখে নেন, যা জমা হয় সিল করা বাক্সে। ধরুন, কোনোভাবে যদি ইভিএমের মেমরি চিপেও জালিয়াতি হল, ভিভিপ্যাটের কাগজের স্লিপ তখনও অকাট্য স্বাক্ষী হয়ে থাকবে। ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ১,৪৪০টি ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হয়েছিল। ফলাফল? শূন্য গরমিল — একটাও ভুল পাওয়া যায় নি। মহারাষ্ট্রের চিফ ইলেক্টোরাল অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন, "ভিভিপ্যাট স্লিপ ও ইভিএম কাউন্টের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।" এবং কোন বিরোধী রাজনৈতিক দল তাঁর এই বক্তব্যের বিরোধিতাও করে নি (তথ্যসূত্র ১০)।

✅ ২০২৪ মহারাষ্ট্র নির্বাচন: ১,৪৪০টি VVPAT স্লিপ গণনায় শূন্য গরমিল — ইভিএম ও কাগজের স্লিপের মধ্যে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য।
VVPAT স্লিপ ভোটার ভেরিফিকেশন গণনা কেন্দ্র

VVPAT স্লিপ, ভোটার যাচাই ও গণনা প্রক্রিয়া — প্রতীকী ছবি

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, রাজনীতিবিদেরা প্রকাশ্যে যতই 'ইভিএম কারচুপি'র চিৎকার করুন না কেন, ভারতে এখনও পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল আদালতে গিয়ে এটা প্রমাণ করতে পারেনি যে, ইভিএমের ফলাফল হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার বদলিয়ে পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁরা কখনোই হার্ডওয়্যার চিপ বদল বা সফটওয়্যার রি-প্রোগ্রামিংয়ের মতো সুনির্দিষ্ট কারিগরি প্রমাণ দিতে পারেননি। নিচে কয়েকটি ল্যান্ডমার্ক মামলা ও আইনি পদক্ষেপের বিবরণ দিলাম, যা পুরো চিত্রটা স্পষ্ট করবেঃ

সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া

ছবি: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

১. গুজরাট কংগ্রেসের "ব্লুটুথ হ্যাকিং" তত্ত্ব (২০১৭)
এটিই সম্ভবত সবচেয়ে কাছাকাছি একটি উদাহরণ। গুজরাট নির্বাচনের সময় কংগ্রেস নেতা অর্জুন মোধবাডিয়া অভিযোগ করেন, পোরবন্দরের তিনটি বুথে ইভিএম ব্লুটুথের মাধ্যমে বহিরাগত ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত (হার্ডওয়্যার ট্যাম্পারিং) ছিল এবং চিপ বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দলটি ভোটের আগের দিনই সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে যায়। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেশ করার বদলে তারা শুধুমাত্র VVPAT স্লিপ গণনার আর্জি জানিয়েছিল, আর সুপ্রিম কোর্ট সেটি সরাসরি খারিজ করে দেয়। পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে জানায়, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। (তথ্যসূত্র ১১)

২. বোম্বে হাইকোর্টে কংগ্রেসের ফরেনসিক পরাজয় (২০১৮)
এটাই একমাত্র ঘটনা যেখানে কারচুপির অভিযোগ পরীক্ষা করতে ফরেনসিক ল্যাব ব্যবহার করা হয়েছিল। কংগ্রেস প্রার্থী অভয় ছাজেদ ২০১৪ সালের পরাজয়কে চ্যালেঞ্জ করে ইভিএম টেম্পারিংয়ের অভিযোগে বোম্বে হাইকোর্টে একটি নির্বাচনী মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে হায়দ্রাবাদের সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (CFSL) ইভিএমটি এক্স-রে ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ডিটেক্টরের মাধ্যমে পরীক্ষা করে। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়, কোনো ব্লুটুথ, ওয়াই-ফাই, ইনফ্রারেড ডিভাইস বা 'বিদেশী বস্তু' খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ডেটা অ্যাক্সেসেরও কোনো প্রমাণ নেই। এর ভিত্তিতেই আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেয়। (তথ্যসূত্র ১২)

৩. 'বার্ন্ট মেমোরি' ও সফটওয়্যার যাচাইয়ের দাবি
৩(১). ADR ও কংগ্রেস নেতার দাবি (২০২৫) — অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR) এবং কংগ্রেস নেতা সর্ব মিত্তের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় যে, ইভিএমের 'বার্ন্ট মেমোরি'র ডেটা মুছে ফেলা যাবে না। তারা সম্ভাব্য সফটওয়্যার ম্যানিপুলেশন যাচাইয়ের কথা বললেও, কেউই এই দাবি করেননি যে, আদালতে জমা দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁদের কাছে আছে। (তথ্যসূত্র ১৩)
৩(২). BSP-র মার্কিন বিজ্ঞানীদের দোহাই (২০১৭) — বহুজন সমাজ পার্টি (BSP) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে বলে যে, মার্কিন বিজ্ঞানীরা নাকি ইভিএম হ্যাক করতে পারেন। কিন্তু 'হয়তো হতে পারে', এই যুক্তিতে আদালত চলে না। তাদের আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। (তথ্যসূত্র ১৪)

৪. সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ: "জিতলে ঠিক, হারলে কারচুপি"
কেন এইসব অভিযোগ টেকে না, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে স্বয়ং সুপ্রিম কোর্ট। বারবার খারিজ হতে থাকা এইসব আবেদন দেখে বিরক্ত হয়ে আদালত বলে ওঠে: "EVM tampered when you lose, fine if you win."। অর্থাৎ, যেদিন আপনি জেতেন, ইভিএম ঠিক আছে; যেদিন হারেন, ইভিএম কারচুপি হয়েছে। এটাই হলো ভারতের রাজনীতির ইভিএম-বিতর্কের সারকথা। (তথ্যসূত্র ১৫)

"EVM tampered when you lose, fine if you win."
— ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

এবার আসি দ্বিচারিতার সবচেয়ে জঘন্যতম দৃষ্টান্তে — যা সম্প্রতি তৈরী হল তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে। এটা হলো ২০২৬-এর বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক এবং একইসঙ্গে ভণ্ডামিতে ভরা অধ্যায়। ৩০ এপ্রিল ২০২৬-এর বর্ষণমুখর রাত। কলকাতার একটা স্ট্রংরুমের বাইরে তৃণমূল নেত্রী ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং উপস্থিত, অন্য আরেক জায়গায় তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ ও শশী পাঞ্জা ধর্নায় বসেছেন। অভিযোগ— "বিজেপি ও ইলেকশন কমিশন মিলে ইভিএম কারচুপি করছে।" তৃণমূল বলছে, "এটা গণতন্ত্রের খুন।" সিসিটিভি ফুটেজে নাকি দেখা গেছে কারা যেন স্ট্রংরুমে ব্যালট বাক্স খুলছে। নির্বাচন কমিশন তখনই জানিয়ে দেয়: "স্ট্রংরুম সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। সেখানে যে কাজ হচ্ছে তা হল পোস্টাল ব্যালটের পৃথকীকরণ, যা সব দলকে জানানো ছিল।" (তথ্যসূত্র ১৬: newindianexpress.com) কলকাতা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া প্রহরা। অথচ তৃণমূলের ধর্না চলতেই থাকে।

স্ট্রংরুম ড্রামা

স্ট্রংরুম ড্রামা — প্রতীকী ছবি

⚠️ দ্বিচারিতার চরম রূপ: যে দল নিজেরাই বলছে ১৯০-২২০ আসনে জিতছে, সেই একই দলের নেত্রী গণনার আগের রাতে স্ট্রংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে ইভিএম কারচুপির চিৎকার করছেন! এ কেমন যুক্তি?

এখন প্রশ্নটা হল যে দল নিজেরাই বলছে যে তারা ১৯০-২২০ আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে, সেই একই দলের নেত্রী কেন ভোট গণনার আগের রাতে স্ট্রংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করবেন "ইভিএম কারচুপি"? এ কেমন যুক্তি? একজন কি একই সঙ্গে মেনে নিতে পারেন যে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে (তাই তৃণমূল জিতবে), আর গণনার সময়ে গণতন্ত্র লুণ্ঠিত হয়েছে (তাই ইভিএম কারচুপির আর্তনাদ)? এই অসুস্থ দ্বিচারিতা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাই নয়, এটা বাংলার ভোটারদের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। স্পষ্টতই, তৃণমূলের এই "ইভিএম কারচুপি" আওয়াজটা ভবিষ্যতের ফল বেরোনোর আগে বানানো অজুহাত; এই একই ফর্মুলা সারা ভারতে ব্যবহৃত হয়। যদি তৃণমূল জেতে, তাহলে বলা হবে "গণতন্ত্র বেঁচে গেল, আমরাই বাঁচিয়েছি"; আর যদি হারেও, তাহলে আগে থেকেই অজুহাত তোলা আছে— "ইভিএম কারচুপি হয়েছে"। অর্থাৎ, জয়-পরাজয় দুটো অবস্থাতেই রাজনৈতিক ফায়দা তোলা।

উল্টোদিকে, বিজেপি-ও কী কম যায়! ২০২৬-এর দ্বিতীয় দফার ভোটের শেষ দিনেই বিজেপি নেতা অর্জুন সিং চিৎকার করে বলেছেন তৃণমূল ডামি ইভিএম দিয়ে কারচুপি করছে। বিজেপি কর্মীরা ভবানীপুরে একটি তৃণমূল গাড়ি আটকে "গাড়ি খোলো" বলে চিৎকার করেছে, দাবি করেছে যে গাড়িতে "ডুপ্লিকেট মেশিন" আছে। ভোট তো তখনো চলছে, কাউন্টিং তো দূর অস্ত, কিন্তু ফলাফলের আগাম অজুহাত ঠিকই তৈরী! (তথ্যসূত্র ১৭: indianexpress.com) অর্থাৎ, গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে একটাই ছবি: যেই দল হারার আঁচ পায়, সেই দল ইভিএমের গলা টিপে ধরে। এই নেতারা কি সত্যিই নিজেদের সমর্থক-শক্তির ম্যান্ডেটে বিশ্বাস করেন? তাঁরা কি বলতে চান যে, বাংলার মানুষ এতটাই অক্ষম যে তাঁরা নিজেদের ভোটও দিতে পারেন না? নাকি তাঁরা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিতেই বিশ্বাস করেন না?

রাজনৈতিক সমাবেশ

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সমাবেশ — প্রতীকী ছবি

উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ অবধি মানুষ এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। এর ফলে তৃণমূলের বিপক্ষে ভোটের হার বাড়বে; কিন্তু সেই বিরোধী ভোট বিভাজিত হবে বাম-আইএসএফ, কংগ্রেস, বিজেপি ও ছোট দলগুলির মধ্যে। আগের নির্বাচনগুলিতে বাম-আইএসএফ ও কংগ্রেস-এর ভোটারদের বুথে আসতে নানাভাবে বাধা দেওয়া হতো। এবার তাঁরা ভোট দিতে পেরেছেন— কিন্তু তৃণমূল-বিরোধী এই ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় সুফল আখেরে তৃণমূলই পাবে। সংখ্যালঘু ভোটের ক্ষেত্রে SIR-এর জেরে ক্ষোভ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভের সরাসরি প্রভাব তৃণমূলের ভোট-ব্যাঙ্কে পড়ে নি; একমাত্র মালদহ ও মুর্শিদাবাদের কিছু আসনে এর ফলে কংগ্রেস লাভবান হতেও পারে। রাজবংশীদের নাম বাদ যাওয়াতে উত্তরবঙ্গে বিজেপির ভোট কমার ও বামেদের ভোট বাড়ার সম্ভাবনা আছে। মতুয়া অধ্যুষিত আসনে বিজেপি জিতলেও তাদের ভোট শতাংশ কমতে চলেছে। মিম-এর আসন জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, জেইউপি একটিতে জিতলেও জিততে পারে। এবার অঙ্কে আসা যাক। দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৩১), উত্তর ২৪ পরগনা (৩৩), কলকাতা (১১), হাওড়া (১৬), হুগলী (১৮), নদীয়া (১৮), মুর্শিদাবাদ (২২) ও মালদহ (১২) — এই ১৬১ আসনের মধ্যে বিজেপি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১৪টি আসনে জয়ী হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ২১টি আসনে এগিয়ে ছিল; এই নির্বাচনে খুব বেশি হলে তারা ২৫টি, বাম-আইএসএফ জোট ৬টি, কংগ্রেস ৫টি পেতে পারে। বাকি ১২৫টি অর্থাৎ ১৬১ আসনের মধ্যে প্রায় ৭৭.৫% আসন এককভাবেই তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে যাওয়ার সম্ভাবনা । ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ২০০-২২০ আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার সম্ভাবনা রয়েছে; সেক্ষেত্রে বাম-আইএসএফ জোট ৮-১২টি, কংগ্রেস ৫-৭টি এবং বিজেপি সর্বাধিক ৬৫-৭০টি আসনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অথচ তার পরেও যে রাজনৈতিক দল গ্রাউন্ড রিপোর্ট অনুযায়ী নিজেরাই বলছে যে তারা ২২০-র বেশী আসনে জিতছে, তারাই গণনার আগের রাতে স্ট্রংরুমের সামনে ধর্না দিচ্ছে ইভিএম কারচুপির অভিযোগে! এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে আসলে তাঁরা গণতন্ত্রকে নাট্যমঞ্চ ছাড়া কিছুই ভাবেন না। জয়কে নিজেদের কৃতিত্ব আর পরাজয়কে যন্ত্রের ব্যর্থতা বানানোর এই ফর্মুলা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্যে বিষের চেয়েও ক্ষতিকর।

মমতা ব্যানার্জি বাম-আইএসএফ-কংগ্রেস

পশ্চিমবঙ্গে এবারে ছিল চতুর্মুখী লড়াই — প্রতীকী ছবি

ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন একটি উদাহরণ নেই যেখানে কোনো রাজনৈতিক দল বৈজ্ঞানিক প্রমাণ-সহ ইভিএম কারচুপির অকাট্য দৃষ্টান্ত পেশ করতে পেরেছে । ৪২টি রায়, ডজন ডজন হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত, CFSL-এর ফরেনসিক রিপোর্ট এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা — সবই বলছে ইভিএম কারসাজি করে একটি গোটা নির্বাচনের ফলাফল বদলানো যায় না। কিন্তু তারপরেও যে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি মিথ্যাচার করছেন এবং জনগণকে ভুল বোঝাতে চাইছেন, তাঁরা আসলে স্বীকার করছেন নিজেদের দেউলিয়াপনা, স্বীকার করছেন বুথ-স্তরের ব্যর্থতা, এবং স্বীকার করছেন যে তাঁরা জনতার ম্যান্ডেটে বিশ্বাসই করেন না। সুতরাং, আগামী ৪ঠা মে বাংলার মানুষকে চোখ খুলে দেখতে হবে যে যাকে তাঁরা ভোট দিলেন, তাঁরা আদৌ সেই ভোট পাওয়ার যোগ্য কিনা! কারণ, যে দল তার ভোটার, সমর্থক ও দলীয় সদস্যদের উপরে ভরসা রাখতে জানে, তাকে ইভিএমের অজুহাত দিতে হয় না।

🗳️ সারসংক্ষেপ: ৪২টি রায়, অসংখ্য ফরেনসিক রিপোর্ট, এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা — সবই একবাক্যে বলে: ইভিএম কারসাজি করে গোটা নির্বাচনের ফল বদলানো সম্ভব নয়। যাঁরা মিথ্যাচার করছেন, তাঁরা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাই স্বীকার করছেন।

📚 তথ্যসূত্র

  • ইভিএম নিরাপত্তা গবেষণাপত্র (ডিসঅনেস্ট ডিসপ্লে ও মেমরি ম্যানিপুলেটর অ্যাটাক) – Wolchok, Wustrow, Halderman, Prasad et al., Proceedings of the ACM Conference on Computer and Communications Security, 2010: mendeley.com
  • ECI নির্দেশিকা: একটি ইভিএমে সর্বোচ্চ ১২০০ ভোট ধারণক্ষমতা – News18: news18.com
  • SIR-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সংখ্যা ৬.৭৭ কোটি – The Quint: thequint.com
  • পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় দফায় ৪১,০০১ পোলিং স্টেশন – ANI: aninews.in
  • M2 বনাম M3 ইভিএম প্রজন্ম ও ব্লুটুথ চিপ-নির্ভর আক্রমণের বিবরণ – The Quint: thequint.com
  • টেম্পার-ডিটেকশন: চেষ্টা করলেই অচল হয়ে যাওয়া ইভিএম সংগ্রহ করছে কমিশন – DNA India: dnaindia.com
  • M3 ইভিএম-এর অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যসমূহ – Indian Express: indianexpress.com
  • ইভিএম মাইক্রোকন্ট্রোলার ওয়ান-টাইম প্রোগ্রামেবল; সুপ্রিম কোর্টে ইসিআই-এর জবাব – ADR India: adrindia.org
  • অটোমেটিক 'কিল সুইচ' সহ আসছে নতুন M3 ইভিএম – News18: news18.com
  • ১০ ২০২৪ মহারাষ্ট্র নির্বাচনে ১৪৪০টি VVPAT স্লিপে শূন্য গরমিল – CEO Maharashtra, ANI: aninews.in
  • ১১ গুজরাট কংগ্রেসের "ব্লুটুথ হ্যাকিং" ও ইভিএম চিপ প্রোগ্রামিং-এর অভিযোগ খারিজ – Zee News: zeenews.india.com
  • ১২ বোম্বে হাইকোর্টে কংগ্রেস প্রার্থী অভয় ছাজেদের ইভিএম হার্ডওয়্যার টেম্পারিং অভিযোগ এবং CFSL হায়দ্রাবাদের ফরেনসিক রিপোর্টে নিষ্প্রমাণ – DNA India: dnaindia.com
  • ১৩ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ: ইভিএমের 'বার্ন্ট মেমোরি' অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে; ADR ও সর্ব মিত্তের সফটওয়্যার যাচাইয়ের দাবি – The Hindu: thehindu.com
  • ১৪ BSP-র সুপ্রিম কোর্টে মার্কিন বিজ্ঞানীদের দোহাই দিয়ে ইভিএম হ্যাক ও টেম্পারিং-এর আবেদন প্রত্যাখ্যান – DNA India: dnaindia.com
  • ১৫ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক মন্তব্য: "জিতলে ইভিএম ঠিক, হারলে কারচুপি" – Daily Pioneer: dailypioneer.com
  • ১৬ ৩০ এপ্রিল ২০২৬: তৃণমূলের ইভিএম কারচুপির অভিযোগ, মমতার স্ট্রংরুম পরিদর্শন, ও EC-র প্রত্যাখ্যান – New Indian Express: newindianexpress.com
  • ১৭ ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ডামি ইভিএম-কারচুপির পাল্টা অভিযোগ – Indian Express: indianexpress.com
অনির্বাণ তলাপাত্র

অনির্বাণ তলাপাত্র

সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

📞 +91-8582849326  |  ✉️ anirbantalapatra@gmail.com

#PeoplesMandate #LastWord #GroundSurvey2026 #WBassemblyelection2026 #EVMTruth #DemocracyWins #StopDisinformation #ScienceOverMyths #VVPAT #SupremeCourtOnEVM #42Rulings #NoEvidenceOnlyExcuses #BengalVotes2026 #ElectoralIntegrity #EVMHackingMyth #FactCheck #VoteWithConfidence